কিশোর কুমার: শিল্প দুনিয়ার অলরাউন্ডার!

Admin

অক্টোবর ১৩ ২০২১, ১১:২১

  • প্রতিভার এক বিস্ময় ছিলেন তিনি। গান গাইতেন, লিখতেন, সুর করতেন, সঙ্গীত পরিচালনা করতেন, অভিনয় করতেন, চিত্রনাট্য লিখতেন এবং প্রযোজনাও করতেন! একজন মানুষ যখন এত ক্ষেত্রে বিচরণ করেন, সেটাও আবার বীরদর্পে; তখন বলার অপেক্ষা থাকে না যে, তিনি কতটা প্রতিভাবান আর মেধাবী মানুষ ছিলেন।
  • তার প্রতিভার আলো প্রজ্বলিত হয়েছিল, আর আলোকিত করেছে উপমহাদেশের শিল্প জগতকে। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গীত জগতকে তিনি সীমাহীনভাবে সমৃদ্ধ করে গেছেন। যার ফলে আজও তিনি স্মরণীয়, বরণীয়।
  • বলছি কিশোর কুমারের কথা। যার কণ্ঠ ভুলিয়ে দেয় মনের অবসাদ, ক্লান্তি, যার মিউজিক অনুসরণ করে গানের ভুবনে চলছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। আজ তার চলে যাবার দিন। ১৯৮৭ সালের ১৩ অক্টোবর না ফেরার দেশে পাড়ি জমান এই শিল্প ব্যক্তিত্ব। তার প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধা।
  • ১৯২৯ সালের ৪ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেছিলেন সঙ্গীতের বিরল প্রতিভা কিশোর কুমার। ভারতের মধ্যপ্রদেশের খাণ্ডোয়াতে এক মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে তার জন্ম। তার আসল নাম আভাস কুমার গাঙ্গুলি।
  • কিশোর কুমারের বাবা কুঞ্জলাল গাঙ্গুলি ছিলেন একজন উকিল। তার বড় ভাইয়ের নাম অশোক কুমার, যিনি বলিউডের একজন খ্যাতিমান অভিনেতা। কিশোর যখন শৈশবে বেড়ে উঠছেন, তখন তার বড়দা অশোক কুমার হিন্দি সিনেমার নিয়মিত অভিনেতা।
  • অশোক কুমারের সাফল্যের সুবাদে তাদের পরিবার প্রায়শই তৎকালীন বোম্বেতে ঘুরতে আসতেন। তখন আভাস কুমার গাঙ্গুলি তার নাম পরিবর্তন করে রাখেন কিশোর কুমার। এবং বোম্বে টকিজের একজন কোরাস শিল্পী হিসেবে গান গাওয়া শুরু করেন।
  • কিশোরের প্রথম সিনেমায় অভিনীত সিনেমা ‘শিকারি’। ১৯৪৬ সালের এই সিনেমার মূল চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অশোক কুমার। প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে তার অভিষেক হয় ১৯৪৮ সালে।
  • সঙ্গীত পরিচালক খেমচাঁদ প্রকাশ ‘জিদ্দি’ সিনেমায় কিশোর কুমারকে ‘মারনে কি দুয়ায়ে কিউ মাঙ্গু’ গানটি গাওয়ার সুযোগ দেন। এরপর বেশ কিছু কাজের প্রস্তাব পান তিনি। কিন্তু গুরুত্বের সঙ্গে সেভাবে কোনো কাজে যুক্ত হননি তিনি।
  • ১৯৫১ সালে কিশোর কুমার প্রথমবারের মতো প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। সিনেমার নাম ছিল ‘আন্দোলন’। বোম্বে টকিজ প্রযোজিত এই সিনেমা নির্মাণ করেছিলেন ফানি মজুমদার। সিনেমাটি খুব বেশি সাফল্য না পেলেও কিশোর কুমার নতুন নতুন সিনেমায় কাজের প্রস্তাব পেতে থাকেন। কিন্তু অভিনয়ের চেয়ে গানের দিকেই ছিল তার মনোযোগ। যদিও বড় ভাই অশোক কুমার চাইতেন কিশোর কুমার অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক।
  • ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত কিশোর কুমার ২২টি সিনেমায় অভিনয় করেন। যার মধ্যে ১৬টি সিনেমাই ছিল ফ্লপ। যার কারণে অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেয়ার ক্ষেত্রে তিনি সংশয়ে পড়েন। তার একের পর এক ব্যর্থতার কারণে বহু পরিচালক তাকে সিনেমা থেকে বাদ দিয়েছিলেন।
  • অবশ্য ওই সময়ে তার ক্যারিয়ারে পাঁচটি সফল সিনেমা ছিল। এগুলো হচ্ছে- ‘লাডকি’, ‘নাওকারি’, ‘মিস মালয়েশিয়া’, ‘চার পায়সে’ ও ‘বাপ রে বাপ’। এই সিনেমাগুলোর সাফল্যের কারণে কিশোর কুমার অভিনয় ছাড়েননি।
  • পরবর্তীতে কিশোর কুমার অভিনীত আরও অনেক সিনেমাই সফল হয়েছিল। সেই তালিকায় রয়েছে- ‘নিউ দিল্লি’, ‘নায়া আন্দাজ’, ‘ভাগাম ভাগ’, ‘ভাই ভাই’, ‘আশা’, ‘চালতি কা নাম গাদি’, ‘দিল্লি কা থাগ’, ‘জালসাজ’, ‘বোম্বে কা চোর’, ‘চাচা জিন্দাবাদ’, ‘মান মাউজি’, ‘ঝুমরু’, ‘হাফ টিকিট’, ‘মি. এক্স ইন বোম্বে’, ‘গঙ্গা কি লেহরে’, ‘হাম সাব উস্তাদ হ্যায়’, ‘পেয়ার কিয়ে যা’ ও ‘পাডোসান’ ইত্যাদি।
  • কিশোর কুমারের সঙ্গীত প্রতিভা প্রকাশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অবদান শচীন দেব বর্মণের। তিনি একদিন অশোক কুমারের বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন, কিশোর কুমার কে এল সাইগালের মতো করে গান গাইবার চেষ্টা করছেন। তখন এস ডি বর্মণ বলেছিলেন, ‘সাইগালের স্টাইল নকল না করে তুমি নিজের মতো করেই গাইতে পারো। তোমার নিজস্ব স্টাইল তৈরি করো’।
  • এরপর কিশোর কুমার নিজের ঢঙয়ে গাইতে শুরু করেন। পঞ্চাশ থেকে সত্তর দশকে এস ডি বর্মণের মিউজিকে দেব আনন্দের সিনেমার জন্য কিশোর কুমার বহু গান করেছেন। এছাড়া আর ডি বর্মণের মিউজিকেও কিশোর কুমারের অনেক গান কালজয়ী হয়েছে।
  • বলিউডের প্রায় সব বিখ্যাত অভিনেতার ঠোঁটে উঠেছে কিশোর কুমারের গান। এই তালিকায় আছেন ধর্মেন্দ্র, রাজেশ খান্ন, অমিতাভ বচ্চন, জিতেন্দ্র, দেব আনন্দ, শশী কাপুর, মিঠুন চক্রবর্তী, বিনোদ খান্না, দিলীপ কুমার, রণধীর কাপুর, ঋষি কাপুর, নাসিরুদ্দিন শাহ, সঞ্জয় দত্ত, অনিল কাপুর, রজনীকান্ত, চাঙ্কি পাণ্ডে, গোবিন্দ ও জ্যাকি শ্রফের মতো তারকারা। তবে সবচেয়ে বেশি রাজেশ খান্নার জন্য গান গেয়েছেন কিশোর কুমার। রাজেশ খান্নার ৯২ টি সিনেমায় অন্তত ২৪৫টি গান করেছেন কিশোর। এরপর জিতেন্দ্রর জন্য ২০২টি, দেব আনন্দের জন্য ১১৯টি এবং অমিতাভ বচ্চনের জন্য ১৩১টি গান করেছেন কিশোর কুমার।
  • কিশোর কুমারের গাওয়া জনপ্রিয় গানের তালিকা বিশাল। এর মধ্যে আছে- ‘এক লাডকি ভিগি ভিগি সি’, ‘কই হামদাম না রাহা’, ‘ঝুমে রে ঝুমে’, ‘কেহনে কি নাহি বাত’, ‘দিলবার মেরে’, ‘মুসকুরাতা হুয়া মেরা’, ‘আগার তুম না হোতে’, ‘দিল কিয়া কারে’, ‘পাল পাল দিল কে পাস’, ‘আনেওয়ালা পাল’, ‘কিতনে সাপনে’, ‘ইয়ে শাম মাস্তানি’, ‘মেরে মেহবুব কায়ামাত হোগি’, ‘ভিগি ভিগি রাতো মে’, ‘মেরে নেয়না সাওয়ান ভাদো’, ‘রিমঝিম ঘিরে সাওয়ান’, ‘রূপ তেরা মাস্তানা’, ‘মেরে সামনেওয়ালি খিড়কি মে’ ইত্যাদি।
  • কিশোর কুমারের গাওয়া অসংখ্য কালজয়ী বাংলা গানও রয়েছে। ‘একদিন পাখি উড়ে’, ‘সে যেন আমার পাশে’, ‘আশা ছিল ভালোবাসা ছিল’, ‘আমার পূজার ফুল’, ‘আজ এই দিনটাকে’, ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’, ‘কি আশায় বাঁধি খেলাঘর’, ‘আজ থেকে আর ভালোবাসার’, ‘আমি যে কে তোমার’, ‘ওপারে থাকবো আমি’ গানগুলো তারই গাওয়া।
  • শ্রেষ্ঠ গায়ক হিসেবে কিশোর কুমার ৮ বার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পেয়েছিলেন। এছাড়া চারবার বিএফজেএ পুরস্কার রয়েছে তার ঝুলিতে।
  • ব্যক্তিগত জীবনে কিশোর কুমার চারটি বিয়ে করেছেন। তার প্রথম স্ত্রী বাঙালি গায়িকা ও অভিনেত্রী গুমা ঘোষ। তারা সংসার করেছেন ১৯৫০ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত। এরপর ১৯৬০ সালে কিশোর কুমার বিয়ে করেন অভিনেত্রী মধুবালাকে। সেই সংসার টিকেছিল ৯ বছর। এরপর অভিনেত্রী যোগিতা বালির সঙ্গে ঘর বাঁধেন কিশোর কুমার। ১৯৭৬ সালে বিয়ের পর তাদের সম্পর্ক টিকেছিল মাত্র দুই বছর। সর্বশেষ তিনি লীনা চান্দভারকারকে বিয়ে করেছিলেন ১৯৮০ সালে। অমিত কুমার ও সুমিত কুমার নামে দুই সন্তান রয়েছে কিশোর কুমারের।