ধামাকায় ৭৫০ কোটির মধ্যে আছে মাত্র লাখ টাকা

Admin

সেপ্টেম্বর ২৯ ২০২১, ১২:২০

‘ধামাকা শপিং ডট কম’-এর কোনো প্রকার অনুমোদন ও লাইসেন্স নেই। নেই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট।

ব্যবসা পরিচালনায় ইনভেরিয়েন্ট টেলিকম বাংলাদেশ লিমিটেড নামক প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে ব্যবসায়িক লেনদেন করেছে ধামাকা। এ পর্যন্ত প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে।

২০১৮ সালে শুরু হওয়া ‘ধামাকা ডিজিটাল’ ২০২০ হতে ‘ধামাকা শপিং ডট কম’ নামে কার্যক্রম শুরু করে। বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে ওই অ্যাকাউন্টে রয়েছে লাখ খানেক টাকা।

শুধু তাই নয়, বর্তমানে ধামাকার কাছে সেলাররা পাবে প্রায় ১৮০-১৯০ কোটি টাকা। ধামাকার কাছে কাস্টমার পাবে ১৫০ কোটি টাকা। এছাড়া কাস্টমার রিফান্ড চেক বকেয়া আছে ৩৫-৪০ কোটি টাকা।

বুধবার (২৯ সেপ্টেম্বর) ভোরে র‍্যাব সদর দফতরের গোয়েন্দা শাখা ও র‍্যাব-২ এর অভিযানে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকা হতে সিরাজুল ইসলাম রানা (৩৪), ইমতিয়াজ হাসান সবুজ (৩১) ও ইব্রাহিম স্বপনকে (৩৩) গ্রেফতার করা হয়।

বুধবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‍্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান লাখ লাখ গ্রাহককে পণ্য ডেলিভারি না দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করার বিষয়টি দেশব্যাপী ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

‘বিভিন্ন লোভনীয় গগনচুম্বী অফারের মাধ্যমে প্রলুব্ধ করে সাধারণ জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে বেশ কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন সংস্থা ই-কমার্সের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কাঠামো নিয়ে পর্যালোচনা ও অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছে।’

খন্দকার আল মঈন বলেন, অনিয়মের অভিযোগ উঠায় ই-কমার্সের আড়ালে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছে।

এছাড়া বিভিন্ন আলোচনায় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি উঠে এলে বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী অভিযোগ দায়ের করেন।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর টঙ্গী পশ্চিম থানায় এক ভুক্তভোগী প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ‘ধামাকা শপিং ডট কম’-এর চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সিওওসহ ১১জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। যার মামলা নং (টঙ্গী পশ্চিম থানা) ১৩।

এছাড়া আরও বেশকিছু ভুক্তভোগীর অভিযোগ রয়েছে। জানা যায়, ভুক্তভোগীরা বিভিন্ন সময়ে অপমান হেনস্থা ও ভয়ভীতির স্বীকার হয়েছেন।

এরই ধারাবাহিকতায় আজ বুধবার প্রতিষ্ঠানটির ওই তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রাহকদের প্রতারিত হওয়ার বিভিন্ন বিষয়াদি ও কৌশল সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়।

কমান্ডার মঈন বলেন, সিরাজুল ইসলাম রানা ‘ধামাকা শপিং ডট কম’-এর সিওও। ইমতিয়াজ হাসান সবুজ ‘মোবাইল ফ্যাশন ও লাইফ স্টাইল’র ক্যাটাগরি হেড এবং ক্যাটাগরি হেড (ইলেক্ট্রনিক্স) হিসেবে ইব্রাহীম স্বপন নিযুক্ত রয়েছেন।

জানা যায়, ২০১৮ সালে ‘ধামাকা ডিজিটাল’ যাত্রা শুরু করে। ২০২০ হতে ‘ধামাকা শপিং ডট কম’ নামে কার্যক্রম শুরু করে। গ্রেফতাররা ২০২০ হতে এই প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত। গত বছরের অক্টোবর হতে প্রতিষ্ঠানটি নেতিবাচক এগ্রেসিভ স্ট্র্যাটেজি নিয়ে মাঠে নামে।

র‍্যাবের এ গণমাধ্যম শাখার প্রধান বলেন, ধামাকার কোনো প্রকার অনুমোদন ও লাইসেন্স নেই; ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট নেই। ব্যবসা পরিচালনায় ইনভেরিয়েন্ট টেলিকম বাংলাদেশ লিমিটেড নামক প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ব্যবসায়িক লেনদেন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, এ পর্যন্ত প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে ওই অ্যাকাউন্টে মাত্র লাখ খানেক টাকা জমা রয়েছে। বর্তমানে সেলার বকেয়া রয়েছে প্রায় ১৮০-১৯০ কোটি টাকা, কাস্টমার বকেয়া ১৫০ কোটি টাকা এবং কাস্টমার রিফান্ড চেক বকেয়া ৩৫-৪০ কোটি টাকা।

জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতাররা জানিয়েছে, আর্থিক সংকটের কারণে গত কয়েক মাস যাবত প্রতিষ্ঠানের অফিস এবং ডিপো ভাড়া বকেয়া রয়েছে; পাশাপাশি জুন ২০২১ থেকে কর্মচারীদের বেতন বকেয়া রয়েছে। চলতি বছরের গত এপ্রিল হতে ধামাকা অর্থ অন্যত্র সরিয়ে ফেলার কারণে জুলাই হতে সকল কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

ধামাকার ব্যবসায়িক অবকাঠামো সম্পর্কে কমান্ডার মঈন বলেন, মহাখালীতে তাদের প্রধান কার্যালয় এবং তেজগাঁও বটতলা মোড়ে একটি ডেলিভারি হাব রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ছয়শটি ব্যবসায়িক চেইন রয়েছে। তারমধ্যে নামীদামী প্রতিষ্ঠানের নামও উঠে এসেছে।

ধামাকা ছাড়াও তাদের আরও কয়েকটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যেমন- ইনভেরিয়েন্ট টেলিকম বাংলাদেশ লিমিটেড, মাইক্রো-ট্রেড ফুড এবং বেভারেজ লিমিটেড এবং মাইক্রো-ট্রেড আইসিক্স লিমিটেড ইত্যাদি।

মূলত প্রতিষ্ঠানটির মূল উদ্দেশ্য তৈরিকারক ও গ্রাহক চেইন বা নেটওয়ার্ক থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া।

এছাড়া ‘হোল্ড মানি প্রসেস প্লান’ অর্থ্যাৎ গ্রাহক ও সরবরাহকারীর টাকা আটকিয়ে রেখে অর্থ সরিয়ে ফেলা ছিল অন্যতম উদ্দেশ্য। বিশাল অফার, ছাড়ের ছড়াছড়ি আর নানাবিধ অফার দিয়ে সাধারণ জনগণকে প্রলুব্ধ করা হতো। এভাবে যাতে দ্রুততম সময়ে ক্রেতা বৃদ্ধি সম্ভবপর হয়।

‘ধামাকা শপিং ডট কম’ গ্রাহক সংখ্যা ৩ লক্ষাধিক। মোবাইল, টিভি, ফ্রিজ, মোটরবাইক, গৃহস্থলীপণ্য ও ফার্নিচারসহ বিভিন্ন অফারে বিক্রি করা হতো।

ধামাকার বিভিন্ন লোভনীয় অফারগুলো হলো, সিগনেচার কার্ড ২০ থেকে ৩০ শতাংশ, ধামাকা নাইট এ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত, রেগুলার এ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ছাড়।

সিগনেচার কার্ড অফারটি গত মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত পরিচালনা করা হয়। মাত্র ২০ শতাংশ পণ্য সরবরাহ করে অর্থ সরিয়ে গ্রাহকদের চেক প্রদান করা হয়। অতঃপর ধীরে ধীরে সকল অর্থ সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

জিজ্ঞাসাবাদে আরও জানা যায়, ধামাকা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে মূলত তারা ইনভেনটরি জিরো মডেল এবং হোল্ড মানি প্রসেস প্লান ফলো করত। কয়েকটি দেশি-বিদেশী ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের লোভনীয় অফারের আলোকে ‘ধামাকা শপিং ডট কম’ ব্যবসায়িক স্ট্র্যাটেজি তৈরি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ইনভেস্টমেন্ট ছিল না।

এতদিন ধরে ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া কীভাবে ব্যবসা করে আসছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত অক্টোবর থেকে তারা এগ্রেসিভ বিজনেসে যায়। ধামাকা খুব অল্প সময়েই মোটা অঙ্কের অর্থ সরিয়ে ফেলে। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের ১৪টি অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করেছে। সিআইডির তদন্তেও অস্বচ্ছতার বিষয়টি উঠে আসছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা পাবার পর থেকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাজ করছে। যাদের বিরুদ্ধেই মামলা হচ্ছে, তারা যেই হোক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

গ্রাহকের ৭৫০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। অথচ এখন ধামাকার অ্যাকাউন্টে এখন মাত্র লাখ খানেক টাকা।

বাকি টাকা কোথায় গেলো জানতে চাইলে কমান্ডার মঈন বলেন, ধামাকার ট্রেড লাইসেন্স নেই। সাধারণ গ্রাহকরা যে টাকা দিয়েছে তা গেছে ইনভেরিয়েন্ট টেলিকমের অ্যাকাউন্টে। ধামাকার আরও অনেক ব্যবসা রয়েছে। সেসব ব্যবসায় সেই টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে।

টাকা আসলে কোথায় গেলো তা মানি লন্ডারিং পর্যায়ে পড়েছে কিনা তা খুব দ্রুতই বেড়িয়ে আসবে। মূলহোতা জসিম উদ্দিন চিশতির নিজস্ব সম্পদ রয়েছে আড়াইশ কোটি টাকার উপরে। সেখানেও ধামাকার গ্রাহকদের টাকা যেতে পারে।

ধামাকার প্রতারণার মূলহোতা জসিম উদ্দিন চিশতির কোথায় জানতে চাইলে কমান্ডার মঈন বলেন, তিনি পলাতক। আমরা জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারদের মাধ্যমে জেনেছি তিনি দেশের বাইরে রয়েছেন। তাকেসহ অন্যান্য আসামিদের খুঁজছি।

আরেক প্রশ্নের জবাবে কমান্ডার মঈন বলেন, হাজারের উপরে তাদের কর্মী রয়েছে। তারা কেউই গত জুন থেকে বেতন পাচ্ছেন না। ধামাকায় আসলে চাকরি করার সুযোগ নেই। তাদের ট্রেড লাইসেন্স নেই।

কমান্ডার মঈন বলেন, গ্রেফতাররা ধামাকার ব্যবসায়িক কারসাজি সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে অবগত থেকে বিভিন্ন প্রতারণামূলক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থেকেছেন।

এছাড়া তারা বিভিন্ন অপকৌশল প্রণয়নে প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শ, সুপারিশসহ বিভিন্নভাবে সহায়তা প্রদান করছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।